রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক অফ বরোদা (Bank of Baroda)-র ঋণ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তথ্যের অধিকার আইনে পাওয়া জবাব অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৫-২৬—এই ছয় অর্থবর্ষে ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বকেয়া থাকা ঋণগ্রহীতাদের অ্যাকাউন্টে মোট ৩৫,৭১৫ কোটি টাকা ‘টেকনিক্যাল রাইট-অফ’ করেছে ব্যাঙ্ক। একই সময়ে ওই ধরনের অ্যাকাউন্ট থেকে ৯,৯৪৬ কোটি টাকা আদায়ের তথ্যও দিয়েছে ব্যাঙ্ক। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ঋণগ্রহীতাদের নাম প্রকাশ না করায়।
এই তথ্য সামনে এসেছে পুনের আরটিআই কর্মী বিবেক ভেলণকর (Vivek Velankar)-এর করা আবেদনের পর। তিনি ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বকেয়া থাকা বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে কত টাকা রাইট-অফ করা হয়েছে, কত টাকা আদায় হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতা বা সংস্থাগুলির নাম কী—তা জানতে চেয়েছিলেন। ব্যাঙ্ক ৩০ জুলাই ২০২৬-এর জবাবে মোট অঙ্কের তথ্য দিলেও ঋণগ্রহীতাদের নাম বা অ্যাকাউন্টভিত্তিক বিবরণ প্রকাশ করেনি।
এখানে ‘রাইট-অফ’ শব্দটির অর্থও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাঙ্ক অফ বরোদার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘টেকনিক্যাল রাইট-অফ’ মূলত হিসাবের খাতা থেকে সম্পূর্ণ ভাবে প্রভিশন করা অনুৎপাদক সম্পদ বা NPA বাদ দেওয়ার একটি হিসাবনিকাশের প্রক্রিয়া। এর অর্থ ঋণগ্রহীতার দায় মুছে দেওয়া বা ঋণ সম্পূর্ণ ভাবে মকুব করে দেওয়া নয়। রাইট-অফের পরেও বকেয়া টাকা উদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারে ব্যাঙ্ক।
ছয় বছরের হিসাব দেখলে বোঝা যায়, সবচেয়ে বেশি রাইট-অফ হয়েছিল ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ অর্থবর্ষে। ওই দুই বছরে যথাক্রমে ১১,৯১৬ কোটি এবং ১১,২৬১ কোটি টাকা টেকনিক্যালি রাইট-অফ করা হয়েছিল। পরের বছরগুলিতেও ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বকেয়া থাকা অ্যাকাউন্টে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের রাইট-অফ হয়েছে।
তবে ৩৫,৭১৫ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যাঙ্ক যে ৯,৯৪৬ কোটি টাকা আদায়ের কথা জানিয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ছয় বছরে রাইট-অফ হওয়া এই বড় অ্যাকাউন্টগুলি থেকে আদায়ের পরিমাণ ২৮ শতাংশেরও কম। ব্যাঙ্ক অবশ্য জানিয়েছে, টেকনিক্যাল রাইট-অফ হলেও সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা বন্ধ হয় না এবং ভবিষ্যতে আদায় হওয়া অর্থ হিসাবেও ধরা হবে।
এ ছাড়াও বড় ঋণ অ্যাকাউন্ট নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ‘হেয়ারকাট’-এর তথ্যও সামনে এসেছে। ২০২০-২১ থেকে ২০২৫-২৬ পর্যন্ত ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বকেয়া থাকা অ্যাকাউন্ট নিষ্পত্তির সময় মোট ৭,৮১৭ কোটি টাকা হেয়ারকাট বা ছাড় হিসেবে দেখিয়েছে ব্যাঙ্ক। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবর্ষে সবচেয়ে বেশি, ৩,১৩২ কোটি টাকা হেয়ারকাটের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
ব্যাঙ্ক অফ বরোদা কেন ঋণগ্রহীতাদের নাম জানাল না, সেটিও এখন আলোচনার কেন্দ্রে। আরটিআইয়ের জবাবে ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, এই তথ্য তৃতীয় পক্ষের ব্যক্তিগত তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তা প্রকাশ করলে গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। টেকনিক্যাল রাইট-অফের ক্ষেত্রে তথ্যের অধিকার আইন, ২০০৫-এর ৮(১)(জ) ধারার উল্লেখ করেছে ব্যাঙ্ক। হেয়ারকাটের ক্ষেত্রে ৮(১)(ডি), ৮(১)(ই) এবং ৮(১)(জ)-এর কথাও বলা হয়েছে।
এই গোপনীয়তার যুক্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন আরটিআই আবেদনকারী বিবেক ভেলণকর। তাঁর বক্তব্য, ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণের মতো বড় অঙ্কের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ছোট ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধারে ব্যাঙ্ক যে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, বড় ঋণের ক্ষেত্রে একই রকম স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কেন থাকবে না—সেই প্রশ্নই তুলেছেন তিনি।
তবে এই আরটিআই জবাব থেকে কোনও নির্দিষ্ট সংস্থা ইচ্ছাকৃত ভাবে ঋণখেলাপি হয়েছে, কোনও ঋণ বেপরোয়া ভাবে মঞ্জুর করা হয়েছিল বা ব্যাঙ্কের কোনও আধিকারিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। প্রকাশিত তথ্য সেই বিষয়গুলি প্রমাণ করে না। ফলে ৩৫,৭১৫ কোটি টাকার অঙ্কটি বড় হলেও তার প্রতিটি ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল, তা জানতে আরও অ্যাকাউন্টভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন।
এই ঘটনার মধ্যেই ব্যাঙ্ক অফ বরোদা জানিয়েছে, টেকনিক্যাল রাইট-অফ কোনও ‘ঋণমকুব’ নয়। ঋণগ্রহীতার দায় বহাল থাকে এবং Debt Recovery Tribunal (DRT), SARFAESI Act, Insolvency and Bankruptcy Code (IBC), National Company Law Tribunal (NCLT) বা আদালতের মাধ্যমে টাকা উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলতে পারে। ফলে ৩৫,৭১৫ কোটি টাকা রাইট-অফের খবরকে সরাসরি ৩৫,৭১৫ কোটি টাকা ঋণ মাফ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তবু ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বকেয়া থাকা অ্যাকাউন্টে এত বড় অঙ্কের টেকনিক্যাল রাইট-অফ, মাত্র ৯,৯৪৬ কোটি টাকার প্রকাশিত আদায় এবং ৭,৮১৭ কোটি টাকার হেয়ারকাট—এই তিনটি পরিসংখ্যান ব্যাঙ্কের ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ঋণগ্রহীতাদের নাম প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তের কারণে বিতর্ক আরও বাড়ছে। এখন নজর, ভবিষ্যতে এই বড় অ্যাকাউন্টগুলির টাকা উদ্ধারে ব্যাঙ্ক কী পদক্ষেপ করে এবং সেই প্রক্রিয়ায় কতটা অর্থ ফেরত আসে।



