পরিযায়ী শ্রমিকের জীবন মানেই অনিশ্চয়তা—পেটের দায়ে ভিন্রাজ্যে কাজ, আর নিজের দেশেই সন্দেহের চোখ। ওড়িশায় গণপিটুনিতে জুয়েল শেখের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে এল আর এক ভয়াবহ সাক্ষ্য। জুয়েলের সঙ্গী মুর্শিদাবাদের আশিক মহম্মদ ভাঙা পা, শরীরজুড়ে কালশিটে নিয়ে শনিবার বাড়ি ফিরেছেন। তাঁর অপরাধ—‘জয় শ্রীরাম’ বলতে অস্বীকার করা, আর ‘বাংলাদেশি’ তকমা।
ঘটনাটি ঘটেছেওড়িশার সম্বলপুরের শান্তিনগর থানা এলাকায়। বুধবার রাত আটটা নাগাদ ভাড়াবাড়ি থেকে সব্জি কিনতে বেরিয়েছিলেন আশিক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরও কয়েক জন পরিযায়ী শ্রমিক। বাজারে যাওয়ার পথে আচমকাই তিনটি বাইকে আসা ছ’জন যুবক তাঁদের পথ আটকায়। মুখ ঢাকা মাস্কে, কপালে তিলক—পরিচয় জানতে চেয়ে প্রথমেই আধার কার্ড দেখাতে বলা হয়। প্রশ্ন তুলতেই শুরু হয় অভিযোগ—“এরা বাংলাদেশি, মার!”
হঠাৎ আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েন আশিকেরা। কেউ পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন। আশিক পালাননি। বোঝাতে চেয়েছিলেন, তিনি এ দেশেরই নাগরিক। কিন্তু তাতেই পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে। আশিকের কথায়, “ওদের এক জন বলল, ‘চল, জয় শ্রীরাম বল।’ আমি বলেছিলাম, মুসলিম ঘরের ছেলে আমি—এ কথা বলতে পারব না।” সেই অস্বীকৃতির পরই নেমে আসে নির্দয় মার।
চড়-থাপ্পড়ে থামেনি অত্যাচার। আধার কার্ড বার করে দেখাতে গেলেও আক্রমণকারীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আশিকের দাবি, তখনই ওড়িয়া ভাষায় তারা বলছিল—কিছু ক্ষণ আগেই মুর্শিদাবাদের এক জনকে মেরে এসেছে। এরপর লোহার রড বার করে শুরু হয় বেপরোয়া পেটানো। ছ’জনের হাতে-পায়ে ধরেও রেহাই মেলেনি। যত ক্ষণ খুশি, মার চলেছে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা রাস্তায় পড়ে ছিলেন আশিক। শেষে সঙ্গীরা এসে উদ্ধার করেন। কারও মোবাইল থেকে চাচাকে ফোন করে কোনও রকমে খবর দেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর জানা যায়, তাঁর শরীরের তিনটি হাড় ভেঙেছে। শনিবার বাড়ি ফিরে এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না—তিনি বেঁচে ফিরেছেন।
আশিকের কণ্ঠে আতঙ্ক স্পষ্ট। “কয়েক মাস ধরেই শুনছিলাম, বিভিন্ন জায়গায় বাঙালিদের হেনস্থা হচ্ছে। কিন্তু নিজের সঙ্গে এমন হবে ভাবিনি।” আর কখনও ওড়িশায় ফিরতে চান না তিনি। পরিবারের একটাই অনুরোধ—এ রাজ্যেই যেন কাজের ব্যবস্থা হয়, যেন ‘বাংলাদেশি’ অপবাদে আর কোথাও মার খেতে না হয়।
অন্য দিকে, জুয়েল শেখের মৃত্যুর ঘটনায় সুতি থানায় এফআইআর দায়ের হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে প্রতিবেশী রাজ্যে যাচ্ছে রাজ্য পুলিশের একটি দল। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আরও একবার উঠে এল এই ঘটনার পর।






