শুভেন্দু অধিকারীর ‘গড়’ নন্দীগ্রামে ফের বড় ধাক্কা খেল বিজেপি। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয় সমবায় সমিতির নির্বাচনে জয় তুলে নিল তৃণমূল কংগ্রেস। আমদাবাদ সমবায় সমিতিতে জয় পাওয়ার সাত দিনের মাথায় এবার রানিপুর সমবায় সমিতিতেও সবুজ শিবিরের দাপট—৪৫টি আসনের মধ্যে তৃণমূলের ঝুলিতে ২৭, বিজেপির প্রাপ্তি ১৮। স্থানীয় নেতৃত্বের দাবি, এই সাফল্যের নেপথ্যে বড় ভূমিকা নিয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সেবাশ্রয়’ প্রকল্প—যা নন্দীগ্রামে জনসংযোগের নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
রানিপুর সমবায় সমিতির মোট ৪৫টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়ে গিয়েছিল তৃণমূল। বাকি ৪০টি আসনে ভোটের লড়াই হয় শাসকদল ও প্রধান বিরোধী বিজেপির মধ্যে। ফলাফলে দেখা যায়, ভোটযুদ্ধেও বিজেপিকে পিছনে ফেলে দেয় তৃণমূল—সামগ্রিকভাবে ২৭-১৮ ব্যবধানে জয়ী হয় তারা। রবিবার বিকেল থেকেই পূর্ব মেদিনীপুরের ওই এলাকায় সবুজ আবিরে উৎসবের ছবি ধরা পড়ে।
সমবায় সমিতির ভোট হলেও তৃণমূল শিবিরের কাছে এই জয় যেন কার্যত ‘সেমিফাইনাল’। কারণ, একদিকে এই এলাকাই রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্র। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে চালু হওয়া ‘সেবাশ্রয়’ শিবিরকে ঘিরে এলাকায় যে নতুন জনসমর্থনের ঢেউ উঠেছে—তা সরাসরি ভোটের ফলাফলেও প্রতিফলিত হয়েছে বলে দাবি তৃণমূলের।

তমলুক সাংগঠনিক জেলার তৃণমূল সভাপতি সুজিত রায় বলেন, “আমদাবাদ-২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত বিজেপির দখলে। এমনকি লোকসভা ভোটেও সেখানে বিজেপি এগিয়ে ছিল। কিন্তু এবার মানুষ তৃণমূল মনোনীত প্রার্থীদের জয়যুক্ত করেছেন।” তাঁর দাবি, “এই নির্বাচন সাধারণ নির্বাচনের মতোই গুরুত্ব পাচ্ছে।”
তৃণমূলের আরও অভিযোগ, সাত দিন আগে আমদাবাদ সমবায় হাতছাড়া হওয়ার পর রানিপুরে জয় পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে বিজেপি। সেই কারণে শনিবার রাত থেকে এলাকায় উত্তেজনা ছড়ানো হয়। তৃণমূলের বেশ কয়েকজন কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। যদিও বিজেপি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং পাল্টা তৃণমূলের দিকেই হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ তুলেছে। সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন আহত হওয়ার খবর মিলেছে বলে জানা গিয়েছে।


ভোটের দিন রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে থাকলেও শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন পাশের এলাকা হরিপুরে। বিজেপির দাবি, তিনি সেখানে পূর্বনির্ধারিত দলীয় কর্মসূচিতে গিয়েছিলেন। তবে তৃণমূল শিবিরের অভিযোগ, হরিপুর থেকেই শুভেন্দু নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সফল হননি। বিজেপি নেতৃত্ব এই দাবি কার্যত উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সমবায় ভোটে নাক গলানোর মতো “সময়” বিরোধী দলনেতার নেই।
রানিপুরে হার নিয়ে বিজেপি অবশ্য নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে, এতে তাদের “গ্লানি” নেই। বিজেপি নেতা প্রলয় পালের বক্তব্য, “যে সমবায় সমিতিতে তৃণমূল এত লাফালাফি করছে, সেটা সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা। সেখানে প্রায় ১০০ শতাংশ বাসিন্দাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তবুও আমরা ১৮টি আসনে জয় পেয়েছি। এটা আমাদের কাছে নৈতিক জয়।”

এদিকে, ফল ঘোষণার সময় সেবাশ্রয় শিবিরে এক মজার ঘটনাও ঘটে। জানা যাচ্ছে, বিকেলে নন্দীগ্রামের সেবাশ্রয় শিবিরের দায়িত্বে থাকা তৃণমূল নেতৃত্ব বার বার রানিপুরে ফোন করে ভোটের আপডেট নিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে ভুল শোনায় একজন নেতা ভেবে বসেন বিজেপি নাকি ৩০টি আসনে জয় পেয়েছে। পরে সংশোধিত ফল ২৭-১৮ জানতেই শিবিরে স্বস্তি ফিরে আসে—আর হাসির রেশও ছড়িয়ে পড়ে দলের অন্দরমহলে।
সমবায় ভোট হলেও নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক মানচিত্রে এই জয় নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ—কারণ শুভেন্দুর কেন্দ্রে এক সপ্তাহে পরপর দুই সমবায়ে বিজেপির পরাজয়কে ২০২৬-এর আগে বড় বার্তা হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহল।








