রাত পোহালেই মহালয়া, কেন ও কীভাবে করবেন তর্পণ? পিতৃপক্ষ আসলে কি?

রাত পোহালেই মহালয়া, কেন ও কীভাবে করবেন তর্পণ? পিতৃপক্ষ আসলে কি?
রাত পোহালেই মহালয়া, কেন ও কীভাবে করবেন তর্পণ? পিতৃপক্ষ আসলে কি?

নজরবন্দি ব্যুরোঃ পুজোর ঢাকে কাঠি পড়েছে। করোনা আবহের মধ্যেই আসছেন মা দুর্গা। আর মহালয়া ছাড়া যে পুজো পুজো গন্ধ পায়না আপামর বাঙালি। আজকের রাত পোহালেই মহালয়া, পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনা। হিন্দু শাস্ত্রমতে এদিনই পিতৃলোকে ফিরে যান পূর্বপুরুষরা। তর্পণ শব্দটির সঙ্গে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। মহালয়ার দিন বহু মানুষকে তর্পণ করতে দেখা যায় গঙ্গারঘাটে।

প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে এই প্রথা। কথিত আছে এই সময় প্রয়াত পূর্বপুরুষের আত্মা পৃথিবীর খুব কাছে বিরাজ করে। তাই এসময় যদি পিতৃপুরুষের তর্পণ করা হয় তবে সকল উদ্দেশ্য সফল হয় বলে বিশ্বাস মানুষের। পিতৃপক্ষের শেষ দিন, অর্থাৎ সর্বপিতৃ অমাবস্যা বা বিসর্জনী অমাবস্যা অথবা মহালয়ার দিনে তর্পণ ও শ্রাদ্ধ করে মর্ত্যে আগত পূর্বপুরুষদের বিদায় জানানো হয়। শুরু হয় দেবীপক্ষ

মহালয়ার সাথে তর্পণ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তর্পণ শব্দটার উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত ‘তৃপ্’ (অর্থাৎ সন্তুষ্ট করা) থেকে। হিন্দুধর্মে দেবতা, ঋষি ও মৃত পূর্বপুরুষদের (পিতৃকুল ও মাতৃকুল) উদ্দেশ্যে জল নিবেদন করে তাঁদের সন্তুষ্ট করার পদ্ধতিকে তর্পণ বলা হয়। বংশের যে সকল‌ পিতৃপুরুষ পরলোক গমন করেছেন, তাঁদের প্রীতির উদ্দেশ্যে মন্ত্র উচ্চারণপূর্বক স-তিল জল (তিল মেশানো জল) দান করে  সাধারণত পুত্রসন্তানেরা পিতৃতর্পণ করে থাকেন। এভাবে তর্পণ করাকে আবার তিল তর্পণও বলে।

তর্পনে ভগবান ও পূর্বপুরুষের আত্মার নাম উচ্চারণ করে তাঁদের কাছে সুখ-শান্তি প্রার্থনা করা হয়। পিতৃ ও মাতৃ তর্পণের সময় জল, তিল, চন্দন, তুলসীপাতা ও ত্রিপত্রী আর অন্যান্য তর্পণের সময় তিলের পরিবর্তে ধান বা যব ব্যবহার করা হয়। আর চন্দন, তিল ও যব না থাকলে কুরুক্ষেত্র মন্ত্র পাঠের জলে তুলসী পাতা দিয়ে তর্পণ করতে হয়।

রাত পোহালেই মহালয়া, কেন ও কীভাবে করবেন তর্পণ? পিতৃপক্ষ আসলে কি?

durga 1
রাত পোহালেই মহালয়া, পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনা। 

হিন্দুশাস্ত্রে নানারকম তর্পণের কথা বলা হয়েছে, যেমন, দেব তর্পণ, মনুষ্য তর্পন, ঋষি তর্পণ, দিব্যপিতৃ তর্পন, যম তর্পণ, ভীষ্ম তর্পণ, পিতৃ তর্পণ, মাতৃ তর্পণ, অগ্নিদগ্ধাদি তর্পন, রাম তর্পন ও লক্ষণ তর্পণ ইত্যাদি। এর মধ্যে পিতৃতর্পণ রীতিই সাধারণ মানুষের মধ্যে অধিক প্রচলিত। এর অপর নাম পিতৃযজ্ঞ।

পিতৃতর্পণের সাথে রামায়ণের রামচন্দ্র এবং মহাভারতের মহাবীর কর্ণ সম্বন্ধীয় দুটো কাহিনী প্রচলিত আছে। রামায়ণের রামচন্দ্র মহালয়ার দিন  পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করেছিলেন। অনেকের ধারণা তখন থেকেই পিতৃ তর্পণের প্রচলন হয়েছে। আবার কর্ণ সম্বন্ধীয় কাহিনীতে বলা হয় যে, কর্ণ চিরকাল মানুষকে স্বর্ণ, রত্ন ইত্যাদি দান করে গেছেন কিন্তু তিনি পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে কখনো জল বা খাদ্য দান করেননি। কারণ তিনি নিজের পিতৃপুরুষের পরিচয় জানতেন নাঅ্যা এটা ছিল কর্ণের অনিচ্ছাকৃত একটা ভুল।

তবুও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর মহাবীর কর্ণের আত্মা স্বর্গে গেলে সেখানে তাঁকে খেতে দেয়া হয় শুধুই সোনা আর ধনরত্ন। তখন কর্ণ এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন দেবরাজ ইন্দ্রকে। এর উত্তরে ইন্দ্র কর্ণকে বললেন যে, কর্ণ সারাজীবন মানুষকে সোনাদানাই দান করেছেন, পিতৃপুরুষকে কখনো জল দেননি, তাই  তাঁর সাথে এমনটা করা হয়েছে। তখন কর্ণ দেবরাজ ইন্দ্রকে তাঁর  অনিচ্ছকৃত ভুলের কথা জানালে ইন্দ্র কর্ণকে এক পক্ষকালের জন্য মর্ত্যে ফিরে গিয়ে পিতৃপুরুষকে জল ও অন্ন দিতে অনুমতি দেন। ইন্দ্রের কথা মতো এক পক্ষকাল ধরে কর্ণ মর্ত্যে অবস্থান করে তাঁর পিতৃপুরুষকে অন্নজল দিলেন। এর ফলে কর্ণের পাপ স্খলন হলো এবং যে পক্ষকাল কর্ণ মর্ত্যে এসে পিতৃপুরুষকে জল দিলেন সেই পক্ষটি পরিচিত হলো পিতৃপক্ষ নামে। আর আজকের রাত পোহালেই মহালয়া, শেষ হবে পিতৃপক্ষ, সূচনা হবে দেবীপক্ষের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here