সত্যজিৎ রায়ের প্রতিভা প্রস্ফুটিত হতে পেরেছিল তাঁর মায়ের জন্য।

সত্যজিৎ রায়ের প্রতিভা প্রস্ফুটিত হতে পেরেছিল তাঁর মায়ের জন্য।

নজরবন্দি ব্যুরোঃ  ডাক্তার প্রাণকৃষ্ণ  আচার্য ছিলেন  কলকাতার সাধারণ  ব্রাহ্মসমাজের  একজন  বিশিষ্ট সভ্য। একদিন সুকুমার রায় সমাজের কাজে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন।সেই সময় বাড়ির ভেতর থেকে এক কিশোরীর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে পান, ‘ তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী’।সুকুমার প্রাণকৃষ্ণবাবুর কাছে গায়িকার পরিচয় জেনে নেন। এ ঘটনা তাঁর বিলেত যাত্রার আগের । বিলেত থেকে ফেরার পর তাঁর বিয়ের জন্যে ব্রাহ্মসমাজের মহিলাদের একটি তালিকা দেখান হয়েছিল।যার মধ্যে ওই মেয়েটির নাম ছিল না। একবার চোখ বুলিয়েই সুকুমার বলেছিলেন, তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়।

আরও পড়ুনঃ সপ্তাহে ২ দিন লকডাউন ঘোষণার দিনে রাজ্যে আক্রান্ত ২২৮২, মৃত্যু ৩৫ জনের। #BreakingNews

১৯১৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর, সুকুমার সেই মেয়েটিকেই বিবাহ করেন। তিনি ছিলেন ঢাকার বিখ্যাত জমিদার, সমাজসেবক ও সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ কালীনারায়ন গুপ্তের নাতনি, সরলা ও জগৎচন্দ্র দাশের কন্যা সুপ্রভা। ডাকনাম টুলু । দীর্ঘ দোহারা গড়ন, শ্যামবর্ণের সুপ্রভার মুখশ্রী ছিল অপরূপ। সরল মাধুর্যের সঙ্গে অনন্য সহজাত আভিজাত্য মেশানো ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বে, লিখেছিলেন নলিনী দাশ।ঢাকা থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে তিনি বেথুন কলেজে পড়ার জন্যে কলকাতায় এসে তাঁর মেসোমশাই ডাক্তার প্রাণকৃষ্ণ আচার্যের বাড়িতে থাকতেন। সুপ্রভা দেবীর মাধুর্য স্বভাব আর সুমধুর আচরণে সবার খুব প্রিয় ছিলেন। কর্মকুশলতা এবং সেবা কার্যে তাঁর তুলনা ছিল না। এই সুপ্রভা রায় ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের মা।

মাত্র দশ বছর স্থায়ী হয়েছিল সুকুমার-সুপ্রভার দাম্পত্য জীবন। সুকুমার রায় মারা যাবার পরে পরেই সুপ্রভার মা সরলা অসুস্থ হয়ে পরেন। তাঁকে সেবা শুশ্রুষা করার জন্যে দু’বছরের শিশু পুত্রকে দেওর, কুলদারঞ্জনের কন্যা মাধুরীলতার কাছে রেখে চলে যান। কয়েক মাস পর নিজের বাড়িতে ফিরে দেখেন পারিবারিক ব্যবসা, বাড়ি সব দেউলিয়া হয়ে গিয়ে নীলামে বিক্রি হওয়ার পথে। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ছত্রাকার হয়ে যায়। শিশু পুত্রকে নিয়ে তিনি দক্ষিণ কলকাতার বকুলবাগানে তাঁর ভাই প্রশান্তকুমার দাশের বাড়িতে উঠে আসেন।

তাঁর অবিবাহিত ভাই কাজ করতেন একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে। সুপ্রভা গোটা সংসারটিকে নিজের কাঁধে তুলে নেন । বাড়ির রান্নাবান্না ছাড়াও সংসারের হিসেব নিকেসের দায়িত্বও ছিল তাঁর হাতে। এসব সত্বেও নিজের এবং পুত্রের খরচ নিজেই করবেন বলে চাকরি নিয়েছিলেন অবলা বসু প্রতিষ্ঠিত বিদ্যাসাগর বানীভবনে। সেখানে বিধবা মহিলাদের শিক্ষার পাশাপাশি তাঁদের নিজের পায়ে দাঁড়াবার জন্যে নানা ধরণের জিনিস তৈরি করে বিক্রির ব্যবস্থা করা হতো। সেলাই, তাঁত, দরজির কাজ, মাটির মূর্তি, চামড়ার নানান দ্রব্য, এমব্রয়ডারির কাজ ছাড়াও নানা ধরণের আচার জ্যাম, জেলি তৈরি শেখানো হতো। সুপ্রভা সেখানে ছিলেন শিল্পভবনের তত্ত্বাবধায়িকা। এমন কি বহু বছর পর ১৯৪০ সাল নাগাদ যখন ঝাড়গ্রামে বাণীভবনের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তাঁকে পাঠানো হয়েছিল শাখাটিকে সংগঠিত করে দিতে।

তাঁর হাতের কাজ ছিল অসাধারণ। সেলাই বোনা, চামড়ার কাজ ছাড়াও তিনি সেই সময়ের বিখ্যাত মৃৎশিল্পী নিতাই পালের কাছে মাটির মূর্তি বানানো শিখে নিয়েছিলেন। সুপ্রভার তৈরি প্রজ্ঞা পারমিতার মূর্তি অনেকদিন পর্যন্ত বিশপ লেফ্রয়ের বাড়িতে দেখেছি। সম্প্রতি শুনলাম সেটি ভেঙে গেছে। সুপ্রভা সেই ১৯২৪/২৫ সালে দক্ষিণ কলকাতা থেকে বাসে করে রাজা বাজার সায়েন্স কলেজের উল্টোদিকের রাস্তায় বাণীভবনে চাকরি করতে আসতেন।বাড়ির সব কাজ করে, চাকরি করতে যাওয়াই শুধু নয়, বিকেলে বাড়ি ফিরে, সন্ধ্যেবেলায় শিশুপুত্রকে পড়াতে বসতেন। প্রায় ৮ বছর বয়স পর্যন্ত সত্যজিৎকে তিনি ইংরেজি, বাংলা, অঙ্ক, ইতিহাস, ভূগোল পড়াতেন। ইংরেজি গল্পের বই পড়ে শুনিয়ে তার বাংলা করে দিতেন।আর্থার কোনান ডয়েলের ব্লু জন গ্যাপ বা ব্রাজিলিয়ান ক্যাট মায়ের কাছে শুনেই শিশু সত্যজিতের মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।

সেই স্মৃতিই তাঁকে প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সে এসে অনুবাদ করতে বাধ্য করায়।সত্যজিতের শিল্প প্রতিভার উন্মেষের মূলে তাঁর মায়ের প্রেরণা ও উৎসাহই মুখ্যত কার্যকরী হয়েছে।সুপ্রভার গানের গলা যে মাধুর্যময়, সে কথা আগেই বলেছি। ব্রাহ্মসমাজের অনুষ্ঠানে তাঁর গান ছিল অনিবার্য। সক্কাল বেলায় স্নান করে পুত্রকে নিয়ে কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটের ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে পৌঁছে যেতেন।গানের দলের তিনি ছিলেন প্রধান গায়িকা। এমন কি রবীন্দ্রনাথের ট্রেনিংয়ে বন্দেমাতরম ও জনগনমন গানের রেকর্ডও করেছিলেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ পাগলামোর সীমা থাকা উচিত, ‘সবজান্তা’ মমতাকে নজিরবিহীন তোপ সুজনের।

কলেজের পড়া শেষ করে সত্যজিৎ ভেবেছিলেন, চাকরি করবেন।কিন্তু তাঁর মায়ের বারংবার তাগাদায় তাঁকে শান্তিনিকেতনে কলাভবনে ভর্তি হতে বাধ্য করায়। পরে সত্যজিৎ বলেছিলেন, *কলাভবনে না ভর্তি হলে তিনি ভারতীয় শিল্পকলায় দীক্ষিত হতে পারতেনই না। ১৯৪৩ এ যখন সিগনেট প্রেস খুললো, সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’ ও ‘হ য ব র ল’ ছাড়াও অন্য বইগুলি বেরিয়েছিল, তা সুপ্রভার আগ্রহেই। সুকুমারের নাটকের সঙ্কলন ‘ঝালাপালা’ বেরোবার সময় নাটকের গানগুলির স্বরলিপি করে দেওয়া হয়েছিল। সুকুমারের লেখা ও সুর দেওয়া গানগুলি সুপ্রভার অসাধারণ স্মৃতি থেকে শুনে ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের শিষ্য সন্তোষকুমার রায় স্বরলিপি করে দিয়েছিলেন। সত্যজিতের কিশোর বয়স থেকেই ইচ্ছে ছিল, বড় হয়ে চাকরি করলে মাকে সঙ্গে নিয়ে আলাদা বাড়িতে থাকবেন । ১৯৪৮ সাল নাগাদ তিনি মাকে সঙ্গে নিয়ে চলে আসেন লেক এভিনিউয়ের ভাড়া বাড়িতে।সত্যজিৎ যখন টাকার অভাবে পথের পাঁচালী ছবির শ্যুটিং বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন, তখন এই সুপ্রভা দেবীই প্রথম প্রস্তাব দেন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের কাছে আবেদন করার বিধান রায়ের অত্যন্ত প্রিয় পাত্রী শ্রীমতী বেলা সেনের সঙ্গে সুপ্রভার আলাপ ছিল। তিনিই সরাসরি বেলা সেনকে গিয়ে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে যদি বিধান রায় ‘পথের পাঁচালী’ ছবির দায়িত্ব নেন, তবে তাঁর পুত্র, সত্যজিৎ ছবিটি শেষ করতে পারেন।

বেলা সেনের অনুরোধ বিধান রায় ফেলতে পারেননি।পরবর্তী কালে ছেলের গর্বে গর্বিত মা সত্যজিতের  সমস্ত পেপার কাটিং নিজে কেটে একটি বড়  খেরোর খাতায় আটকে রাখতেন।১৯৬০ সাল থেকেই তিনি অসুস্থ হতে শুরু করেন।  ডায়াবেটিস   সঙ্গে হার্টে ব্লকও ধরা পড়ে ১৯৬০ এর  ২৭ নভেম্বর  রাত ২.১৫ মিনিটে   তাঁর মৃত্যু  হয়। বয়স হয়েছিল  ৬৮ বছর।তিনি যখন চিরনিদ্রায় মগ্ন, তাঁর  গলায় একটি  শুকনো,  বিবর্ণ মালা দেখা যায়। ভালো  করে দেখে বোঝা যায়, সেটি একটি  পুরনো শুকিয়ে যাওয়া বেল ফুলের গড়ে -মালা। সেটি ছিল তাঁর  বিবাহের মালা বদলের মালা।  তিনি  সেটি একটি চন্দন  কাঠের বাক্সে সাতচল্লিশ বছর ধরে সযত্নে  রক্ষা করে এসেছিলেন। পুত্রকে বলে রেখেছিলেন, শেষ যাত্রায় যেন তাঁকে এই মালাটি পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বামীঅনুগতপ্রাণা সুপ্রভাদেবীর ব্যক্তিত্ব  শেষ দিনটিতেও বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মতো মা পেয়েছিলেন বলেই সত্যজিৎ রায়ের প্রতিভা প্রস্ফুটিত হতে পেরেছিল।   

 সংগৃহীত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *