তিন কার্তিকের পুজো, জড়িয়ে জমিদার বাড়ির ইতিহাস

তিন কার্তিকের পুজো, জড়িয়ে জমিদার বাড়ির ইতিহাস
তিন কার্তিকের পুজো, জড়িয়ে জমিদার বাড়ির ইতিহাস

নজরবন্দি ব্যুরোঃ  আগামীকাল কার্তিক পুজো। তাই নিয়ম মত আজ মাঝরাতের মধ্যেই সদর দরজার সামনে পৌছে যাবে কার্তিক, তাই বলে তিন কার্তিকের পুজো! পশ্চিম বর্ধমান জেলার এক গ্রাম গৌড়বাজার সেখানে একসাথে পুজো হয় তিনটে কার্তিকের। প্রত্যন্ত গ্রাম হওয়ার কারণে এর পেছনে থাকা ইতিহাস প্রচারের আড়ালে রয়েই গেছে বর্ধমান(পশ্চিম বর্ধমান) জেলায় গৌরবাজার পান্ডবেশ্বর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্বের এক গ্রামে বিগত ১৬৬ বছর ধরে এই পুজো হয়ে আসছে বলে অনুমান। এই পুজোর বিশেষত্ত হল তিনটি কার্তিক যাদের নাম বড় কার্তিক, মেজো কার্তিক, ছোটো কার্তিক।

আরও পড়ুনঃCalcutta High Court : বড়দিনে সাদামাটা পার্ক স্ট্রীট, একগুচ্ছ নির্দেশিকা জারি হাইকোর্টের

অনেকের কাছে বিষয়টা অদ্ভূত এবং কৌতূহলের, যে পুজো হলে তো একটি কার্তিক এর হবে এখানে একই ঠাকুরের তিনটি মূর্তি কেনো?,উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। শোনা যায় অতীতে অনেক জমি,বর্ধমান রাজাদের তত্ত্বাবধানে পালদের জমিদারি তখন রমরমা। সারা গ্রাম থেকে আশে পাশের গ্রামে পালেদের জমিদারি ছিল বিশেষ। জানা যায় আনুমানিক ১৮৫৩ সাল নাগাদ জমিদার জয় নারায়ণ পাল, শ্যামপাল, লক্ষী নারায়ণ পালের কোনো সন্তান জন্ম না হওয়ায়, তারা চরম চিন্তায় ছিলেন।

তিন কার্তিকের পুজো, জড়িয়ে জমিদার বাড়ির ইতিহাস
তিন কার্তিকের পুজো, জড়িয়ে জমিদার বাড়ির ইতিহাস

অনেক উপায় অবলম্বন করেও কোনও সুরাহা হয় নি। তখন এক রাত্রে স্বপনাদেশে জয় নারায়ণ পাল দেখেন “যে নিরস্বার্থ কার্তিক পুজো করতে হবে তাদের তিন ভাইকে তবেই তাদের শুন্য কোল আলো হবে।” তাই তারা তিন ভাই মিলে অভিনব ভাবে মন্দির তৈরি করে একসাথে তিনটি কার্তিক পূজা করা শুরু করেন।তারপরে আনুমানিক ১৮৫৭ সালে লক্ষী নারায়ণ পাল এর এক পুত্র সন্তান লাভ হয় ধজাধারি পাল, এবং আরো দুই ভাই এর একটি করে কন্যা সন্তান লাভ হয়।

সেই সৌভাগ্যবসত পরম্পরা অনুযায়ী পুজো করে আসছেন বংশধরেরা এবং এই সন্তান না হওয়ার অন্ধকার এই বংশকে আর এসে ঘিরে ধরেনি। সময়ের সাথে জমিদারি গত হয়ে গিয়েছিলো,হঠাৎ করে আর্থিক সঙ্কট এসে ধরেছিল পাল পরিবারকে, ধজাধারির দুই সন্তান এর মধ্যে এক সন্তান কানাইলাল পাল জমিদারির অবশিষ্ট জমি চাষ করে অবস্থা কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন আর অন্য একজন বলরাম পাল ছিলেন পেশায় স্কুল শিক্ষক ।

এই রকম আর্থিক অনটনের সময়েও এই দুই ভাই কার্তিক পুজো করতে ছাড়েননি, পুজো কিন্তু কষ্ট করে হলেও ওনারা করে গিয়েছেন। এটাই ভক্তির আর পরম্পরার আসোল পরিচয়। আজ পুনরায় তাদের বংশধরদের আর্থিক অবস্থা ভালো হয়েছে, পুজো আজ ও সমান গতিতে বজায় আছে।

সময়ের সাথে সাথে পুজোর অনেক রীতি নীতি বদলে গিয়েছে আগে কেরোসিনের আলোতে পুজো হয়েছে, ঠাকুর বিসর্জন হয়েছে কাঁধে করে তুলে নিয়ে গিয়ে। বর্তমানে এই সব বদলে এসেছে আধুনিকরন। আজ ইলেকট্রিক আলো, রমরমা সঙ্গীতের সাথে উৎসবে মেতে ওঠা, চলে আনন্দের এক বিশেষ আমেজ। সারা পরিবারের সব সদস্য প্রায় 20-25 জনের বেশি সদস্য এই পুজোর সময়ে একত্রিত হয়ে মেতে ওঠে পুজোতে।

কথিত আছে এই কার্তিক কে ভক্তি করে কেউ কিছু চাইলে কোনোদিন খালি হাতে ফেরে না। বিশেষ করে সন্তান সুখ না থাকলে এই তিন কার্তিক এর কাছে ভক্তি করে চাইলে শুন্য কোল পূর্ন হয়। এই বিশেষ কার্তিক পুজো পরম্পরা অনুযায়ী আজও রাত্রি 12 টার পরে শুরু হয়, কিন্তু আগে পুজো হতো চার প্রহর ধরে সেটি এখন পরিবর্তন হয়ে এক প্রহরে এসেছে।

তিন কার্তিকের পুজো, যাদের নাম বড় কার্তিক, মেজো কার্তিক, ছোটো কার্তিক

তিন কার্তিকের পুজো, জড়িয়ে জমিদার বাড়ির ইতিহাস
তিন কার্তিকের পুজো, জড়িয়ে জমিদার বাড়ির ইতিহাস

প্রসাদ বিতরণ হয় পরের দিন সকালে, সেই দিন রাত্রিতে গ্রামের মানুষ দের ভোগ খাওয়ানো হয়।
এই বিশেষ রীতিতে এই পুজো প্রায় যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে।