হিমাচল প্রদেশে যেন আচমকাই নেমে এসেছে হিম দুর্যোগ। পাহাড়ি রাজ্যের শৈলশহরগুলিতে একটানা হালকা থেকে ভারী তুষারপাতের জেরে বরফে ঢেকে গিয়েছে রাস্তা, আর সেই সঙ্গে থমকে গিয়েছে গোটা মানালি। কোঠি থেকে মানালি যাওয়ার প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে গাড়ির সারি—চারপাশে তুষারের চাদর, গতি নেই চাকার, আর রাতভর গাড়ির ভিতরেই আটকে পড়তে হয়েছে হাজার হাজার পর্যটককে।
জানুয়ারির শেষদিকে আবহাওয়ার আচমকা বদলেই শুরু হয়েছে তুষারপাত। শীতের মরসুমের শুরুতে প্রত্যাশিত তুষারপাত না হলেও নতুন বছরে আবহাওয়া ঘুরতেই বরফ নামতে শুরু করেছে হিমাচলে। আর তুষারপাত মানেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের ঢল। প্রশাসন সূত্রে খবর, পঞ্জাব, হরিয়ানা, চণ্ডীগড় এবং দিল্লি থেকে সপ্তাহান্তে বিপুল সংখ্যক পর্যটকের গাড়ি ঢুকেছে মানালি, শিমলা এবং কুফরির মতো জনপ্রিয় পর্যটনস্থলগুলিতে।


মানালিতে হোটেল বুকিং ১০০ শতাংশ, বিপাকে পর্যটকেরা
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মানালিতে বর্তমানে প্রায় ১০০ শতাংশ হোটেল বুকিং হয়ে গিয়েছে। ফলে বহু পর্যটক পৌঁছে হোটেল না পেয়ে সমস্যায় পড়ছেন। বাধ্য হয়ে কেউ কুলু, কেউ বা কুফরি-র দিকে রওনা হচ্ছেন বিকল্প আশ্রয়ের খোঁজে।

রাজ্য জুড়ে ৬৮৫-৭০০ রাস্তা বন্ধ, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি লাহুল-স্পিতিতে
তুষারপাতের জেরে হিমাচল প্রদেশের বিস্তীর্ণ অংশ কার্যত অচল। প্রশাসন সূত্রে জানা যাচ্ছে, রাজ্য জুড়ে বন্ধ হয়ে রয়েছে ৬৮৫টি রাস্তা। সবচেয়ে বেশি রাস্তা বন্ধ লাহুল ও স্পিতি জেলায়, সেখানে বন্ধ রাস্তার সংখ্যা ২৯২টি। এছাড়াও—
-
চম্বা: ১৩২টি রাস্তা বন্ধ
-
মন্ডী: ১২৬টি
-
সিরমৌর: ২৯টি
-
কিন্নৌর: ২০টি
-
কাংড়া: ৪টি
-
উনা: ২টি
-
সোলান: ১টি রাস্তা বন্ধ
অন্যদিকে রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের দাবি অনুযায়ী, পরিস্থিতি আরও জটিল—শনিবার পর্যন্ত বন্ধ রাস্তার সংখ্যা প্রায় ৭০০। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে রয়েছে দুটি জাতীয় সড়কও—৩ নম্বর এবং ৫০৫ নম্বর জাতীয় সড়ক।
শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই শুরু যানজট, রবিবারও কাটেনি দুর্ভোগ
স্থানীয় সূত্রের খবর, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই মানালির পথে যানজট তৈরি হয়। কিন্তু রবিবার পর্যন্ত রাস্তা পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়ায় আটকে পড়েছেন কয়েক হাজার পর্যটক। ফলে মানালি এবং আশপাশের একাংশ কার্যত স্তব্ধ।
শিমলা থেকেও একই চিত্র। শিমলা থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে ঢাল্লিতে দীর্ঘ গাড়ির লাইন, আর বিখ্যাত হিন্দুস্তান-টিবেট রোড বরফের পুরু চাদরে ঢেকে যাওয়ায় গাড়ি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বরফে বিচ্ছিন্ন একাধিক এলাকা
তুষারপাতের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে একাধিক অঞ্চল—
কিন্নৌর, শিমলার নারকান্ডা, জুব্বল, কোটখাই, কুমারসৈন, খারাপাথর, রোহরু এবং চৌপল—এসব এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে।
অন্যদিকে তুষারপাতের পাশাপাশি রাজ্যের কিছু জেলায় ঘন কুয়াশার সতর্কতা জারি হয়েছে।
কাংড়া, মন্ডী, সোলান, উনা, বিলাসপুর এবং হামিরপুরে দৃশ্যমানতা কমার আশঙ্কা রয়েছে।
২৬ থেকে ২৮ জানুয়ারি আরও ভারী তুষারপাতের পূর্বাভাস, বাড়ছে উদ্বেগ
রাজ্য সরকারের তরফে পর্যটকদের জন্য সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। পশ্চিমি ঝঞ্ঝার প্রভাবে ২৬ থেকে ২৮ জানুয়ারি হিমাচলে আরও ভারী তুষারপাত এবং বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
‘হেঁটেই মানালি পৌঁছতে হয়েছে’, ‘গাড়িতেই কাটল সারারাত’—পর্যটকদের অভিযোগ
বরফ আর যানজটে আটকে থাকা পর্যটকদের দুর্ভোগের ছবিও সামনে এসেছে। দিল্লি থেকে আসা পর্যটক অক্ষয়ের কথায়,
“তিন ঘণ্টা আমরা যানজটে আটকে ছিলাম। তারপর গাড়ি থেকে নেমে হেঁটেই মানালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।”
তিনি জানান, প্রায় সাত কিলোমিটার হেঁটে তাঁরা মানালি পৌঁছেছেন।
আরেক পর্যটক তৃষার কথায়,
“গাড়িতেই সারারাত কাটাতে হয়েছে আমাদের।”
এছাড়াও আটকে পড়া পর্যটকদের অভিযোগ, তুষারপাতের সুযোগ নিয়ে কিছু ট্যাক্সিচালক অতিরিক্ত ভাড়া চাইছেন। পর্যটকদের দাবি, মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য ১০-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া হাঁকা হচ্ছে। তুষারপাতের কারণে গাড়ি মিলছে না—আর সেই সুযোগেই বেড়েছে ‘ডিমান্ড চার্জ’।
পর্যটকদের একটাই আবেদন—পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা এবং অপ্রয়োজনে পাহাড়ি রাস্তায় বের না হওয়া। কারণ হিমাচলে এই মুহূর্তে বরফ শুধু সৌন্দর্য নয়—একেবারে বাস্তব বিপর্যয়।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।





